Revision 6550 of "বিষয়:Miscellaneous" on bnwikibooks

মাতৃভাষার কোন বিকল্প হতে পারে না। মাতৃভাষার মাধ্যমে কোন বিষয় শিক্ষা গ্রহন খুব দ্রুত বোধগম্যতার গভীরে প্রবেশ করতে পারে। প্রকৃতপক্ষে যখন আমরা নিজ ভাষাকে স্বাভাবিক ভাবে ব্যবহার করতে থাকি তখন কিন্তু আমাদের মনে ভাষা কি বা ভাষার উৎপত্তি সর্ম্পকে মনে কোন প্রশ্নই জাগে না। সেই সপ্তদশ শতাব্দীর কবি আবদুল হাকিম নিজ স্বদেশী ভাষা কবিতা লিখেছিলেন। মাতৃভাষার প্রতি আবেগময়তা এবং আনুগত্য নিম্নের কবিতা থেকে সুস্পষ্ট হয়: 
                                                                  দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুয়ায় ।
                                                                  নিজ দেশ ত্যাগী কেন বিদেশে ন যায়।।
                                                                   মাতা পিতামহ ক্রমে বঙ্গেতে বসতি।
                                                                   দেশী ভাষা উপদেশ মনে হিত অতি।।
                                                                                            ''(’নুর-নামা’ কাব্য-আবদুল হাকিম)'
কবি আবদুল হাকিম বাংলা ভাষার বিরুদ্ধবাদীদের প্রতি কঠিন মনোভাব প্রকাশে সংকোচ করেন নি:
                                                                   যে সবে বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।
                                                                   সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।।
সেই ধারাবাহিকতার আঁচল ধরে শেষ পর্যন্ত বাংলা ভাষার বিরূদ্ধে বহু চক্রান্ত ও অবহেলাকে জয় করে আমরা পেলাম:
                                                                       মোদের গরব,মোদের আশা
                                                                         আ-মরি বাংলা ভাষা।
এই বাংলা ভাষা নিয়ে জাতির একটি বেদনাদায়ক পর্ব আছে। ভাষাতাত্ত্বিক আজিজুল হকের ভাষায় <blockquote>“ এই শতাব্দীর শেষার্ধে বাংলা ভাষা যে গৌরবজ্জ্বল অধ্যায়ের সূচনা করেছে,তাকে জানার জন্য বা তাকে সঠিক মর্যদায় প্রতিষ্ঠার জন্য এই ভাষা ব্যবহারকারী মানুষের খুব একটা সচেতন গরজ লক্ষ্য করা যায় না।”</blockquote> রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর(১৮৬১-১৯৪১) বাংলা-ভাষা পরিচয় প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন <blockquote>“ এমন দিন ছিল যখন বাঙালী বিদেশে গিয়ে আপন ভাষাকে অনায়াশেই পুরানো কাপড়ের মতো ছেড়ে ফেলতে পারত; বিলেতে গিয়ে ভাষাকে সে দিয়ে আসত সমুদ্রে জলাঞ্জলি, ইংরেজভাষিণী অনুচরীদের সঙ্গে রেখে ছেলেমেয়েদের মুখে বাংলা চাপা দিয়ে তার উপরে ইংরেজির জয়পতাকা দিত সগর্বে উড়িয়ে। আজ আমাদের ভাষা এই অপমান থেকে উদ্ধার পেয়েছে, তার গৌরব আজ সমস্ত বাংলাভাষীকে মাহাত্ম্য দিয়েছে। বৎসরে বৎসরে জেলায় জেলায় সাহিত্য-সম্মেলন বাঙালির একটা পার্বণ হয়ে দাড়িয়েছে; এ নিয়ে তাকে চেতিয়ে তুলতে হয়নি; হয়েছে স্বভাবতই।”</blockquote>

বাংলা ভাষা সর্ম্পকে বিগতে শতকে বা এই শতকে বা গোড়ার দিকে যে সব প্রচলিত ধারণা ছিলো, তা থেকে বাংলাদেশের মানুষ সরে যেতে পারে নি। বাংলা ভাষার স্বরূপ বিষয়ে শিক্ষিত মানুষের ধারণাও স্পষ্ট নয়। অধিকাংশ মানুষ মনে করেন, সংস্কৃত ভাষার কন্যা হলো বাংলা। সম্ভবত: বাংলা ব্যাকারণ পড়ে তাদের অজ্ঞাতসারেই অনুরূপ ধারণা তাদের মনে স্থান করে নিয়েছে। অন্যদিকে তাদের কাছে সত্য হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত যে, বাংলা ব্যকারণ না পড়লে এই ভাষা শুদ্ধরূপে ‘ লিখিতে, পড়িতে বা বলিতে পারা যায় না।’ কাজেই, সঙগত কারণেই ধরে নেওয়া যেতে পারে যে, এই দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে নিজ ভাষা বিষয়ে একটা মোটা ধারণা দেবার ব্যবস্থাও অনুপস্থিত।” 

একটি ভাষার খুব গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে স্ব-শাসিত ব্যাকারণ(Autonomous grammar)। বাংলা ভাষায় যে ব্যাকরণ তা স্ব-শাসিত নয়। এই ব্যাকরণ ঐতিহ্যগত এবং সংস্কৃত ভাষার ব্যাকরণের কাঠামোতে বাংলা ভাষাকে প্রবিষ্ট করানো হয়েছে। ফলে, বাংলা ভাষার নিজস্ব বৈশিষ্ট সমূহ কখনোই এই ব্যাকরণে ফুটে উঠে নি। বঙ্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ্যায়(১৮৩৮-১৮৯৪) বাঙ্গালা ভাষা প্রবন্ধে উল্লেখ করেছিলেন <blockquote>“ এই সংস্কৃতপ্রিয়তা এবং সংস্কৃতানুকারিতা হেতু বাঙ্গালা সাহিত্য অত্যন্ত নীরস ,শ্রীহীন, দুর্বল; এবং বাঙ্গালা সমাজে অপরিচিত হইয়া রহিল। টেকচাঁদ ঠাকুর প্রথমে এই বিষবৃক্ষের মূলে কুঠারাঘাত করিলেন। তিনি ইংরেজিতে সুশিক্ষিত। ইংরেজিতে প্রচলিত ভাষার মহিমা দেখিয়া ছিলেন এবং বুঝিয়াছিলেন। তিনি ভাবিলেন, বাঙ্গালার প্রচলিত ভাষাতেই বা কেন গদ্যগ্রন্থ রচিত হইবে না ? যে ভাষায় সকলে কথোপকথন করে, তিনি সেই ভাষায় “আলালের ঘরের দুলাল” প্রণয়ন করিলেন। সেই দিন হইতে বাঙ্গালা ভাষার শ্রীবৃদ্ধি। সেইদিন হইতে শুষ্ক তরুর মূলে জীবন বাড়ি নিষিক্ত হইল।”</blockquote> 
(অসমাপ্ত)
--[[ব্যবহারকারী:Dhali mohsin|Dhali mohsin]] ([[ব্যবহারকারী আলাপ:Dhali mohsin|আলাপ]]) ১৯:৪১, ৮ ডিসেম্বর ২০১২ (ইউটিসি)
তথ্যসুত্র:
<ref>বাঙ্গালা ভাষা :বঙ্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ্যায়</ref>
<ref>বাংলা ভাষা পরিচয়:রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর</ref>
<ref>আধুনিক ভাষা তত্ত্বের পরিচয়:আজিজুল হক</ref>